বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২৪
হোমজেলাশেখ হাসিনা সড়ক’ নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবার...

শেখ হাসিনা সড়ক’ নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ হবার আশা

@নিজস্ব প্রতিবেদক:

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা বিজয়নগর। বর্ষা মৌসুমে নৌকা এবং শুষ্ক মৌসুমে জমির আইল ছিল জেলা শহরের সাথে সহজতম যোগাযোগ মাধ্যম। এছাড়া এই উপজেলার সাথে সড়ক পথে যোগাযোগ করতে হলে আখাউড়া বা সরাইল উপজেলা হয়ে ৩৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো। জেলার পূর্বাঞ্চলবাসির জেলা শহরের সাথে যাতায়াতের এই কষ্ট ঘুছিয়েছে একটি সড়ক। পূর্বাঞ্চলবাসির স্বপ্নের ‘শেখ হাসিনা’ সড়ক।
হাওরের উপর এই সড়ক নির্মাণ অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। বছরের অর্ধেক সময় পানিতে টইটম্বুর থাকতো বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা। অবশেষে অনেক চড়াই-উতরাই পেড়িয়ে সম্পন্ন হতে যাচ্ছে বিজয়নগর-সদরের অন্যতম যোগাযোগের এই মাধ্যম। সাড়ে ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়ক শুধু যে শহরের সাথে দূরত্বই কমাবে তা নয়, ভূমিকা রাখবে স্থানীয় কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের লক্ষ্মীমোড়া গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান শাকসবজি বিক্রি করে তার পরিবার চালান। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় উৎপাদিত শাকসবজি শহরের হাটে তুলতে সমস্যা হতো তার। হাওর এলাকা হওয়ায় নৌকায় করে শহরে আসতে আসতে বেলা হয়ে যেতো। এর ফলে বাজারে এসে সবজির ভালো দাম পেতেন না।
তবে এবার শাহজাহান বাড়ি থেকে ‘শেখ হাসিনা সড়ক’ দিয়ে মাত্র আধা ঘণ্টায়ই পৌঁছাতে পারবেন শহরের হাটে। এতে করে পণ্যের ন্যায্য দাম যেমন পাবেন, তেমনি ঘুচবে দীর্ঘদিনের আক্ষেপও।
কৃষক শাহজাহানের মতো পুরো বিজয়নগর উপজেলাবাসীর ভাগ্য বদলে দেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিরাইলকান্দি থেকে বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের সিমনা পর্যন্ত নির্মাণাধীন ‘শেখ হাসিনা সড়ক’। হাওরের বুকে এই সড়কটি বিজয়নগরবাসীর বহু বছরের লালিত স্বপ্ন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের সাথে বিজয়নগর উপজেলার সরাসারি কোনো সংযোগ সড়ক নেই। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জেলার আখাউড়া অথবা সরাইল হয়ে জেলা সদরে আসতে হয়। এতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় পত্তন, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, বিষ্ণুপুর ও পাহাড়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
বর্ষাকালে হাওড় পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে আসতে তাদের একমাত্র ভরসা নৌকা, আর শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হাঁটা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই কয়েক দশক ধরেই বিজয়নগরবাসী দাবি জানিয়ে আসছিলো হাওরের বুকে সড়ক নির্মাণের। কিন্তু হাওরে সড়ক নির্মাণ অনেকটা চ্যালেঞ্জিং ছিল সংশ্লিষ্টদের জন্য। বছরের অর্ধেক সময় পানিতে টইটম্বুর থাকে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী নির্বাচিত হওয়ার পর উদ্যোগ গ্রহণ করেন সিমনা সড়ক নির্মাণের। তার উদ্যোগে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিরাইলকান্দি থেকে বিজয়নগরের পত্তন ইউনিয়নের সিমনা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সড়কটির নামকরণ করা হয় শেখ হাসিনা সড়ক। ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতার কারণে নির্মাণ কাজ বিলম্বিত হলেও এখন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
বর্ষাকালে ভাঙন রোধে সড়কের পাশে বসানো হয়েছে সিসি ব্লক। সড়কের তিনটি সেতুর সবকটিরই নির্মাণ কাজ শেষ। সেতুর এপ্রোচ সড়কের কাজ হয়েছে। কার্পেটিংয়ের কাজও প্রায় অর্ধেক হয়েছে। এরপরই খুলে দেওয়া হবে স্বপ্নের শেখ হাসিনা সড়ক। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাড়ে ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়ক শুধু যে শহরের সাথে দূরত্বই কমাবে তা নয়; ভূমিকা রাখবে স্থানীয় কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিজয়নগর উপজেলায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের আম, লিচু, মাল্টা ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল উৎপাদিত হয়। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় কৃষকরা যথাসময়ে এসব ফল জেলা শহরে নিয়ে যেতে পারতেন না। এতে করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতেন তারা। এখন শেখ হাসিনা সড়ক ব্যবহার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদিত ফল শহরে নিয়ে যেতে পারবেন কৃষকরা।
পত্তন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা বিলকিস বেগম জানান, ‘আগে গ্রামের আশেপাশে কলেজ না থাকায় মেয়েদের শিক্ষা স্কুল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ ছেলেরা শহরে গিয়ে পড়তে পারলেও দূরের পথ হওয়ায় নিরাপত্তার কারণে শহরে পড়তে দেওয়া হতো না মেয়েদের। এখন সড়ক চালু হলে মেয়েরাও শহরে গিয়ে ভালো কলেজে পড়তে পারবে।’
চম্পকনগর ইউনিয়নের চম্পকনগর গ্রামের কৃষক হাবিব মিয়া জানান, প্রতি বছর তার লিচু বাগান থেকে লক্ষাধিক টাকার লিচু বিক্রি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় লিচুগুলো শহরে নিয়ে যেতে না পারায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হয়। শেখ হাসিনা সড়কটি চালু হলে শহরে নিয়ে লিচুগুলো আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
চম্পকনগর বাজারের ব্যবসায়ী মো. রাসেল জানান, ‘জেলা শহর থেকে মালামাল আনার জন্য আখাউড়া অথবা সরাইল উপজেলা ঘুরে যেতে হয়। এতে করে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। আর এর প্রভাব পড়ে পণ্যের মূল্যে। এছাড়া নৌপথে মালামাল আনাটা ঝুঁকিপূর্ণ। শেখ হাসিনা সড়কটি চালু হলে সহজে এবং কম খরচে পণ্য আনা যাবে জেলা শহর থেকে। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এর সুফল পাবেন সাধারণ ক্রেতারাও।’
অন্যদিকে, সড়ক চালু না হলেও হাওরের স্বচ্ছ জলরাশির সঙ্গে নীল আকাশের মিতালি দেখতে এখন থেকেই শেখ হাসিনা সড়কে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। বর্ষাকালে এটিই হয়ে উঠবে অন্যতম পর্যটন স্পট। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা সড়কটিকে কেন্দ্র করে প্রসার ঘটবে ব্যবসা-বাণিজ্যের।
এদিকে,আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এই সড়ক নিয়ে অপপ্রচার শুরু করেছে একটি গোষ্ঠী। সম্প্রতি অতি বৃষ্টিতে নির্মাণাধীন সড়কের মাটি কর্দমাক্ত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যখন বিজয়নগর উপজেলাবাসির স্বপ্নের এই শেখ হাসিনা সড়কের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ দিকে, তখনই একটি গোষ্ঠি এই সড়ক ও সরকারকে নিয়ে অপপ্রচার শুরু করেছে।
এই বিষয়ে বিজয়নগর বিআরডিবির চেয়ারম্যান দীপক চৌধুরী বাপ্পি বলেন, শেখ হাসিনা সড়ক বিজয়নগরবাসির স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন এখন হাতের নাগালে। কিন্তু এই মূহুর্তে একটি গোষ্ঠী এই সড়ককে নিয়ে অপপ্রচার শুরু করেছে। তারা অতীতকে ভুলে গেছেন। আগে জেলা শহরের সাথে বিজয়নগরের যাতায়াত ব্যবস্থা কেমন ছিল তা ভুলে গেছে। কিন্তু তাদের এই অপপ্রচার উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হবে না।
বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, সকল জটিলতা অবসান করে আধুনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি শেখ হাসিনা সড়কের জন্য কাজ করে গেছেন। অবশেষে এই সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সড়ক নিয়ে অপপ্রচার করে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, এই সড়ক নির্মাণের মেয়াদ আরও ৫/৬ মাস রয়েছে। বৃষ্টিতে মাটি কাদা হয়ে এমন হতেই পারে। কাজ শেষ হওয়ার পর কোন সমস্যা হলে প্রশ্ন উঠতো। এখন প্রশ্ন তোলা অবান্তর। সময়ের আগেই এই সড়কের কাজ শেষ হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments